ভাষাভিত্তিক আগ্রাসন এবং ২১ ফেব্রুয়ারী: ফিরে দেখা ইতিহাস

ভাষাভিত্তিক আগ্রাসন এবং ২১ ফেব্রুয়ারী: ফিরে দেখা ইতিহাস
February 21, 2026

ভাষাভিত্তিক আগ্রাসন এবং ২১ ফেব্রুয়ারী: ফিরে দেখা ইতিহাস

প্রমিথিয়াস স্বর্গের বাগান থেকে মানুষের জন্য জ্ঞানস্বরূপ আগুন চুরি করে এনেছিলেন।এই অপরাধের জন্য দেবরাজ জিউস তাঁকে শাস্তি দেন। শাস্তিটা হ'ল, প্রমিথিয়াসকে একটা পাহাড়ে বেঁধে রাখা হবে আর একটা ঈগল জীবন্ত অবস্থায় তাঁর যকৃত ঠুকরে ঠুকরে খাবে, সবটা খাওয়া হয়ে গেলে প্রমিথিয়াসের যকৃত আবার নতুন করে তৈরি হবে, আর ঈগলটা আবার ঠুকরে ঠুকরে খাওয়া শুরু করবে। এইভাবে প্রমিথিয়াস ভোগ করে চলবে অনন্ত যন্ত্রণা। মানুষের জ্ঞানার্জনের স্বাধীনতা ঈশ্বরের কাছেও অনভিপ্রেত! জ্ঞান থেকে জাগ্রত হওয়া চেতনা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় আর প্রশ্ন করা মানুষ শাসকের কাছে বিপজ্জনক, সেই শাসক দেবতাও হতে পারে কিংবা অন্য একজন মানুষ।
শাসক চায় আপন সাম্রাজ্যের বিস্তার; শাসক চায় অধিনস্ত মানুষের চেতনাকে রুদ্ধ করে তার প্রশ্ন করাকে বন্ধ করতে। আর শুনতে অবাক লাগলেও, চেতনাকে রুদ্ধ করার প্রাচীনতম হাতিয়ার হ’ল ভাষাভিত্তিক আগ্রাসন। একটি নির্দিষ্ট ভাষার আগ্রাসনের মাধ্যমে, অধীনস্ত মানুষদের ভাষাকে বিনষ্ট করে, সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতিকে, তার নিজস্বতাকে ও বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে অধীনস্ত মানুষগুলোর চিন্তায় তালা লাগিয়ে প্রতিবাদ সংগঠিত হবার রাস্তাকে রুদ্ধ করার এই মডেলই প্রাচীনতম ভাষাভিত্তিক আগ্রাসনের মডেল।
ইতিহাস…
ইউরোপে দুটো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রায় ৮০০ বছর ধরে নিজেদের মধ্যে ধর্মের নাম নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়েছিল। সেই যুদ্ধ শেষ হবার পর ইউরোপের সবথেকে শক্তিশালী রাজশক্তি হয়ে ওঠে স্প্যানিশরা এবং তারা ইউরোপের বাইরেও সাম্রাজ্য এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করে। স্পেনের রানী ইসাবেলা (১৪৭৪ খ্রীস্টাব্দ – ১৫০৪ খ্রীস্টাব্দ) ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের অভিযানকে অর্থসাহায্য করলেন। এই বছরেই ভাষাতাত্ত্বিক আন্তোনিও ডে নেব্রিজা স্প্যানিশ (কাস্টিলিয়ান) ভাষার প্রথম ব্যাকরণের বই লিখলেন। বইটি তিনি উৎসর্গ করলেন রানী ইসাবেলাকে আর বইয়ের উৎসর্গপত্রে লিখলেন, “ভাষা সর্বদাই সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গী ছিল আর সেটাই চিরকাল থাকবে”।
খুব দ্রুত স্পেনের সামাজ্যবিস্তারের আর তা রক্ষার অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠেছিল কাস্টিলিয়ান বা স্প্যানিশ ভাষা। স্পেনের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন যেখানে যেখানে সংগঠিত হয়েছিল, সেখানেই স্থানীয় ভাষা আর সংস্কৃতিকে দমিয়ে স্প্যানিশ ভাষা ও সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছিল। রানী ইসাবেলা বলেছিলেন, “কাস্টিলিয়ান হল বিদেশে গিয়ে জয়লাভের হাতিয়ার আর স্বদেশে অনিয়ন্ত্রিত বক্তব্যকে দমন করার অস্ত্র”।
ভাষাভিত্তিক আগ্রাসন ও ‘স্বাধীন’ ভারত
স্বাধীনতার পরে পরেই, ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের মুখের ভাষা না হওয়া সত্বেও, হিন্দিকে সংখ্যাগুরুর মুখের ভাষা আখ্যা দিয়ে তাকে ‘রাষ্ট্রভাষায়’ পরিণত করে গোটা ভারতের মাথায় চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়েছিল। দেশজোড়া প্রবল বিরোধিতার মুখে সাময়িকভাবে সেই প্রচেষ্টাকে ধামাচাপা দেওয়া হলেও বলা হয়, সংবিধান প্রণয়নের ১৫ বছর পরে হিন্দিকে সার্বিকভাবে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চালু করে দেওয়া হবে। সেই হিসেবে ১৯৬৫ সাল থেকেই হিন্দির রাষ্ট্রভাষার তকমা পেয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু ১৯৬২-৬৩ সাল থেকেই দক্ষিন ভারতে, বিশেষত তামিলনাড়ুতে, এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ-আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে যাতে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা যান। ফলশ্রুতিতে, তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী বাধ্য হয় হিন্দিকে আরও বেশ কিছু ভাষার সঙ্গে ‘অফিসের ভাষার’ গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখতে।
স্বাধীনতা পাবার আগে থেকেই ভারতের একটা ‘স্বাধীনতা দিবস’ ছিল, ছিল জাতীয় পতাকা কিন্তু হবু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে কোন একটা ভাষাকে সব ভাষার ওপরে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা তখন অনুভূত হয়নি! স্বাধীনতা পাবার ঠিক মুখে মুখে হঠাৎ করেই রাষ্ট্রনেতারা ‘রাষ্ট্রভাষার’ প্রয়োজন অনুভব করতে শুরু করলেন। সংবিধান রচয়িতাদের প্রথম সভার প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল, সভায় হিন্দুস্তানী (হিন্দি নয় কিন্তু) অথবা ইংরেজি এই দুটি মাত্র ভাষায় বক্তব্য রাখা যাবে। সভার অন্যতম সদস্য ও স্বাধীনতা সংগ্রামী রঘুনাথ বিনায়ক ধুলেকার মন্তব্য করেছিলেন, যে ব্যক্তি হিন্দুস্তানী জানেন না, তার ভারতে থাকার অধিকার নেই। কিন্তু দেশভাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভের পর ভৌগোলিক কারনেই হিন্দুস্তানী হয়ে গেল পাকিস্তানের মানুষজনের মধ্যে অধিক প্রচলিত একটি ভাষা। সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক বৈরীতার আবহে স্বাধীন ভারতের কয়েকজন রাষ্ট্রনেতা দাবী তুললেন হিন্দুস্তানী নয়, হিন্দিকে করতে হবে ভারতের রাষ্ট্রভাষা! রঘুনাথ বিনায়ক ধুলেকার পর্যন্ত হিন্দুস্তানীর পক্ষ ত্যাগ করে হিন্দির পক্ষে গলা মেলালেন!
অর্থাৎ রাষ্ট্রভাষার দাবীদার রাতারাতি বদলে গেল! অবশ্য এর পরেও দাবীদার বদলেছে বার বার। হিন্দির বিরুদ্ধে প্রবল জনমত তৈরি হওয়ায়, প্রস্তাব ওঠে সবথেকে ‘শুদ্ধ’, ‘বৈজ্ঞানিক’ আর ‘অধিকাংশ ভারতীয় ভাষার জননী’ (ভাষাতাত্ত্ব অবশ্য বলে যে এই দাবী ভ্রান্ত) সংস্কৃতকে রাষ্ট্রভাষা করার। বাংলাকে এমনকি ইংরেজি হরফে লেখা হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবও ওঠে। অবশ্য হিন্দি ছাড়া অন্য ভাষাদের রাষ্ট্রভাষা হবার দাবী কখনই খুব শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু একটা উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার, যেত তেন প্রকারে রাষ্ট্রভাষা একটা জোটাতেই হবে! ২০১৭ সালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে হিন্দিকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালানো হয়। অর্থাৎ পিছনের দরজা দিয়ে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার মরিয়া চেষ্টা! কিন্তু কেন দরকার একটা রাষ্ট্রভাষা? এমনি এমনি? এসব কী শুধুই অনিয়ন্ত্রিত ঘটনাপঞ্জী নাকি কোন পরিকল্পিত ঘটনাক্রম?
বর্তমান…
বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র যার জন্ম হয়েছিল এই রকমের ভাষাভিত্তিক আগ্রাসনকে প্রতিহত করার মধ্য দিয়ে। পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে আগ্রাসনের কারনে অধীনস্ত হওয়া মানুষজন, ভাষা-সংস্কৃতির জাতিগত নিজস্বতা হারিয়ে আত্মবিস্মৃত হয়ে বৌদ্ধিক দাসত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠী একুশে ফেব্রুয়ারীর দিকে তাকিয়ে নিশ্চেষ্ট এবং মৃতপ্রায় অবস্থা থেকে আবারও জেগে উঠে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, এমনটাই হওয়া উচিৎ ভাষাদিবস পালনের উদ্দেশ্য ও প্রচার পদ্ধতি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক চাকচিক্যের মাঝে ইতিহাস আর অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া জ্ঞান বা জ্ঞানলব্ধ বিপ্রতীপ ভাবনা কেমন যেন বিহ্বল হয়ে পড়ছে! বড় প্রেক্ষাগৃহ, সুবেশ-সুবেশা মানুষজন, মাথায় ফুল গুঁজে ও দামী সুগন্ধী মেখে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের রক্তাত্ব হবার দিনটিকে উৎসবমুখর করে তোলার অশ্লীলতাই আজকের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা দিবস পালনের বাস্তবতা!
রাজনৈতিক একাধিপত্য বিস্তারের যে প্রবণতার নিরিখে, এক ভাষা-এক ধর্ম-এক সংস্কৃতির মধ্যে ভারতের বিপুল বৈচিত্র্যকে অন্তর্ভুক্তির ও তার মধ্য দিয়ে বৌদ্ধিক কারফিঊ জারির যে ভয়ঙ্কর সর্বগ্রাসী প্রয়াস শুরু হয়েছে সে রাস্তা কিন্তু গণতন্ত্রের রাস্তা নয়। তাই একুশের ডাকে থাকুক প্রতিস্পর্ধী ভাবনার চর্চা, থাকুক সুস্থ সংস্কৃতির পালটা আগ্রাসন। নাহলে কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে যাবে।


Author:

Pratip Kumar Dutta

https://isiycc.in/wp-content/video/